মধ্যপ্রাচ্যে কি মার্কিন ঘাঁটির যুগ শেষ? ইরানি ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে পেন্টাগনের নতুন রণকৌশল


 ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ধারণাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আধুনিক যুদ্ধ বাস্তবতায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিগুলোর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলো শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই ঘটায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে শেষ হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ সামরিক ঘাঁটির যুগ?

ইরানের নতুন শর্ত: মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরাতে হবে

সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পরও ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হলো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার।

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ইরানের দাবির কারণেই নয়, বরং নিরাপত্তাগত বাস্তবতার কারণেও ওয়াশিংটন হয়তো নিজ থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বৃহৎ ঘাঁটিগুলোর আকার ছোট করার পথে হাঁটতে পারে।

‘এলএসএ জেনকিন্স’: নতুন মার্কিন কৌশলের প্রতীক

২০২২ সালে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর ইয়ানবুর কাছে যুক্তরাষ্ট্র ‘এলএসএ জেনকিন্স’ নামে একটি সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এই ঘাঁটির কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

কারণ, পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা ও সেনা অ্যাটাশে আব্বাস দাহুকের মতে, ইরানের সরাসরি হামলার আওতার বাইরে থেকে সামরিক অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যেই জেনকিন্স ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল।

ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুগে বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের ধরন

বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেখা গেছে, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কারণে বিশাল ও স্থায়ী সামরিক ঘাঁটিগুলো এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত সামরিক উপস্থিতির মডেল বদলে যেতে পারে।

ডেভিড পেট্রাউসের স্বীকারোক্তি

সিআইএর সাবেক পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর সাবেক প্রধান ডেভিড পেট্রাউস বলেন, ইরান যেভাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়েছে, তাতে সেখানে আগের মতো বৃহৎ সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখার আগ্রহ কমে গেছে।

তার মতে, বর্তমানে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতিও বদলে গেছে। একসময় যেখানে কমান্ডাররা যুদ্ধক্ষেত্রের কাছাকাছি অবস্থান করতেন, এখন অনেক কার্যক্রম দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।

কুয়েতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা

মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মার্কিন সেনা অবস্থান করছে কুয়েতে। দেশটিতে প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

ক্যাম্প আরিফজান এবং আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি সাম্প্রতিক সংঘাতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্রে আলি আল-সালেম ঘাঁটির একটি সামরিক শেলটার ধ্বংস হওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। পাশাপাশি কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

ইন্টারসেপ্টর সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

যুদ্ধের সময় আরেকটি বড় সমস্যা সামনে আসে—মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারসেপ্টর মজুত দ্রুত কমে আসছে।

সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ঘাঁটি রক্ষা করতে গেলে বিপুল সংখ্যক প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবসম্মত নয়।

‘হালকা উপস্থিতি’ নীতির দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ওমানের মতো ‘হালকা উপস্থিতি’ মডেল অনুসরণ করতে পারে।

ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী ঘাঁটি না থাকলেও দেশটি মার্কিন বাহিনীকে বন্দর ও আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ দেয়। ফলে বড় স্থাপনা ছাড়াই কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখা সম্ভব হয়।

বর্তমানে সৌদি আরবও স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটির পরিবর্তে যৌথ প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহযোগিতাভিত্তিক মডেল অনুসরণ করছে।

নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে লোহিত সাগর

ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে বিকল্প সামুদ্রিক রুট খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে পারস্য উপসাগরের পরিবর্তে লোহিত সাগরভিত্তিক সামরিক ও নৌ-লজিস্টিক কৌশল গুরুত্ব পেতে পারে। সৌদি আরবের জিজান বন্দরকে কেন্দ্র করে নতুন পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে।

বড় পরিবর্তনের পথে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে।

এক সময়ের বিশাল ও স্থায়ী ঘাঁটির পরিবর্তে ভবিষ্যতে ছোট, দ্রুত স্থানান্তরযোগ্য এবং কৌশলগতভাবে বিচ্ছিন্ন ঘাঁটির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।

ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার এই অধ্যায় শুধু একটি সামরিক সংঘাত নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক নীতির নতুন যুগের সূচনাও হতে পারে।


সূত্র: মিডেল ইস্ট আই

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ