ইসরাইলি সেনাবাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এয়াল জামির দেশটির নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেনাবাহিনীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযান, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপ এবং সৈন্য সংকটের কারণে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ‘ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার দুয়ারে’ পৌঁছে গেছে।
দেশটির সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১৩ নিউজের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক এক বৈঠকে মন্ত্রীদের উদ্দেশে জামির বলেন, “আমি আপনাদের সামনে ১০টি লাল পতাকা তুলছি। আইডিএফের জরুরি ভিত্তিতে একটি নতুন সেনা নিয়োগ আইন, রিজার্ভ ডিউটি আইন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার মেয়াদ বৃদ্ধির আইন প্রয়োজন। অন্যথায় খুব শিগগিরই সেনাবাহিনী তার নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না এবং রিজার্ভ বাহিনীও টেকসই থাকবে না।”
যুদ্ধের চাপে বাড়ছে সেনা সংকট
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই জনবল সংকটের মুখোমুখি। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা যুদ্ধ শুরু হলে সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বর্তমানে আইডিএফে প্রায় ১২ হাজার সৈন্যের ঘাটতি রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজা উপত্যকা, লেবানন সীমান্ত এবং অন্যান্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিপুলসংখ্যক সেনা মোতায়েনের কারণে নিয়মিত বাহিনী ও রিজার্ভ সদস্যদের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আগেও সতর্ক করেছিলেন সেনাপ্রধান
এটি প্রথমবার নয় যে এয়াল জামির সেনা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতেও তিনি প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu এবং দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছিলেন।
সেই চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি ও অপারেশনাল সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই আরও বাস্তব করে তুলছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
হারেদি ইহুদিদের সামরিক সেবা নিয়ে বিতর্ক
ইসরাইলে সেনা সংকটের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো অতি-রক্ষণশীল হারেদি ইহুদি সম্প্রদায়ের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অংশগ্রহণ।
২০২৪ সালের জুনে Supreme Court of Israel রায় দেয় যে হারেদি ইয়েশিভা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সামরিক সেবা অব্যাহতির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
তবে অতি-রক্ষণশীল ধর্মীয় দলগুলো এখনো তাদের সম্প্রদায়কে সেনাবাহিনীর বাইরে রাখার জন্য বিশেষ আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় ৮০ হাজার হারেদি পুরুষ সামরিক সেবার উপযুক্ত হলেও তাদের অধিকাংশ এখনো সেনাবাহিনীতে যোগ দেননি।
নিরাপত্তা ও রাজনীতিতে নতুন চাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেনা সংকট শুধু সামরিক সমস্যা নয়; এটি এখন ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনা, অন্যদিকে বাধ্যতামূলক সেনা সেবা নিয়ে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ—সব মিলিয়ে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সেনাপ্রধানের সর্বশেষ সতর্কবার্তা দেশটির নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী দিনে নতুন সেনা নিয়োগ আইন ও সামরিক সংস্কার নিয়ে ইসরাইলি পার্লামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
0 মন্তব্যসমূহ